জীবন-জীবিকার লড়াই করে যাচ্ছে তারা
নিউজ ডেস্ক: কাঁকড়াছড়া পানপুঞ্জির প্রবীণতম খাসি নারী কাকা লাকাচিয়াং। তার বয়স ১০০ পেরিয়েছে। তবু জীবন-জীবিকার লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে তাকে। জীবিকা হারিয়ে জীবন বিপন্ন তাদের, পানপুঞ্জিতে দুর্বৃত্তদের ধ্বংসযজ্ঞ সম্পর্কে বলতে গিয়ে বয়োবৃদ্ধ নারীটির কণ্ঠে এই হাহাকার ধ্বনিত হচ্ছিল। গত মে মাসের প্রথম সপ্তাহে কয়েক দফায় উজাড় করে দেওয়া হয়েছিল খাসিদের পানজুম।
খাসিয়া নামে পরিচিত এই আদিবাসীরা নিজেদের খাসি বলে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। শতবর্ষী লাকাচিয়াঙের স্বামী মারা গেছেন অনেক বছর আগে। দেশে যে দুটি আদিবাসী সমাজে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা চালু আছে, তার একটি খাসিরা। স্বামী না থাকলেও ছেলেমেয়েদের নিয়ে তার পরিবার পুঞ্জিতে টিকে আছে কোনোমতে। খাসি এই নারী বাংলাটা ভালো বোঝেন না বলে আরেক খাসি তরুণের সহায়তা নিয়ে কথা চালিয়ে যেতে হয় নাগরিক প্রতিনিধি দলের সদস্যদের।
ঢাকা থেকে যাওয়া ওই প্রতিনিধি দলটিকে লাকাচিয়াং জানান, বসন্ত ও কলেরার মতো মহামারি দেখার স্মৃতি এখনও মনে করতে পারেন তিনি। তিন-চার বছর বয়সে দেখেছিলেন বসন্ত, খাসি ভাষায় যেটিকে তারা বলেন নিয়াংসি। পরে দেখেছেন পেনহিয়ারপ বা কলেরা। কলেরায় এই পুঞ্জিতে বনঠুয়া বা বনমন্ত্রীর ছেলে ও টারজেন ছিল্লা নামে আরেক আদিবাসী মারা যাওয়ার কথাও মনে আছে তার। এখনও চলাফেরা করতে পারেন লাঠি ছাড়াই। তবে তার শক্ত-সমর্থ শরীর মুখের কালো ছায়াটি আড়াল করতে পারেনি। করোনাসহ তিনটি মহামারি পার করলেও এই বয়সে এসে লাকাচিয়াংকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে উচ্ছেদের শঙ্কা। সরেজমিনে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া ও বড়লেখা উপজেলার তিনটি খাসিপুঞ্জি ঘুরে একই চিত্র দেখা গেছে।
রেহানা চা-বাগানে পুঞ্জি বানিয়ে থাকা এই আদিবাসীদের একজন লাকাচিয়াং। এই পুঞ্জির বাসিন্দারা জানান, বাগানের জায়গা বাড়ানোর নামে তারা সম্প্রতি কেটে নিয়ে গেছে আদিবাসীদের পানজুমের হাজারখানেক বনজ ও ফলদ গাছ। পুঞ্জিতে একসময় ৪৭টি পরিবার থাকলেও বিভিন্ন সময়ের এমন উচ্ছেদে এখন সংখ্যাটি ১৭-তে এসে দাঁড়িয়েছে।
শুধু গাছ কাটাতেই থামছে না ঘটনা। পানপুঞ্জিটিতে থাকা খাসি ও মান্দিদের (গারো) মাংরুদামটি (শ্মশান) দখল করে চা-গাছ লাগিয়ে দিয়েছে আরও কয়েক বছর আগে। এই পুঞ্জির মান্ত্রী (প্রধান) জন পল জানান, ২০০৩ সালের দিকে আমাদের প্রায় দেড়শ একরের মতো জমি ছিল। বাগানের দখলের কারণে আমাদের জমির পরিমাণ ৫০-৬০ একরে নেমে এসেছে। আমরা আমাদের অস্তিত্ব নিয়ে শঙ্কায় আছি।
ক্ষতির শিকার হওয়াদের একজন মিন্টু রেমা বলেন, আমার দুই একরের মতো জায়গা ছিল। সেখানে ছিল আমার পানজুম। ওরা আমার সব পানগাছ কেটে ফেলেছে। এতে কমপক্ষে দুই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। আমার সব শেষ। এখন কয়েক মাস ধরে দিনমজুরি করে দিন চলছে। বনজ-ফলদ গাছ ছাড়াও পবিত্র সেরেংগান গাছও কেটে ফেলেছে তারা।
বনাক গাছকে খাসিরা বলেন সেরেংগান। তাদের আদি ধর্ম ‘জেন্টিল’ অনুসারীরা এই বনাক গাছ পূজা করে। বনাক গাছটি শখানেক কাটা হয়েছে এখানকার বন কাটার সময়ে। ২০০১ সালে পাভেল পার্থের এক গবেষণায় এই গাছসহ ৬৭টি গাছ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর কাছে পবিত্র হিসেবে বিবেচিত হয় বলে উল্লেখ রয়েছে। ২০১২ সালের বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে পবিত্র গাছ সংরক্ষণের ধারাটি যুক্ত করা হয়েছিল। এ ছাড়া এই পুঞ্জিতে বনরুই, উড়ন্ত কাঠবিড়ালি, শূকর, খরগোশসহ নানা প্রাণীর আবাস ছিল বলে জানিয়েছেন স্থানীয় খাসি আদিবাসীরা।
এমন উচ্ছেদের শঙ্কায় থাকা কাঁকড়াছড়া পানপুঞ্জিই একমাত্র নয়, মৌলভীবাজারে থাকা ৯২টি চা-বাগানের সর্বত্রই পানপুঞ্জিতেই এই উচ্ছেদ উচ্ছেদ খেলা চলছে বহু বছর ধরে। দু’দিন ধরে নাগরিক প্রতিনিধিদের দলটি মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কাঁকড়াছড়া পানপুঞ্জি ছাড়াও বড়লেখার আগারপুঞ্জি ও বনাখলাপুঞ্জি পরিদর্শন করে এমন চিত্রই দেখতে পেয়েছে।
আগারপুঞ্জিতে কয়েক দিন আগে রাতের আঁধারে খাসি আদিবাসী রিনোস পডুওয়েঙের একটি পানজুমের প্রায় এক হাজার পানগাছ কেটে ফেলা হয়। এই পুঞ্জিতে মান্দি ও খাসি আদিবাসীদের ৪৮টি পরিবারের বাস। তারা সবাই অন্য পুঞ্জির মতো শুধু পানচাষের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। জুমে গেলে দেখা যায়, কেটে ফেলা গাছগুলোর পানপাতা যেন মৃত্যুশোকে মাথা নামিয়ে রেখেছে। পুঞ্জিতে পৌঁছে রিনোসকে লোক পাঠিয়ে খুঁজে আনতে হয়। পুঞ্জিপ্রধানের ডাকে আসেন রিনোস, দু’রাত না ঘুমিয়ে চোখ লাল হয়ে গেছে, দুর্বল শরীর যেন অনিচ্ছাসত্ত্বেও টেনে এনেছেন। মাটির দিকে চোখ রেখে তিনি সবাইকে বলেন, ‘এই পুঞ্জির পান বিক্রি করে আমি পেট চালাই, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাই। পুঞ্জি না থাকলে আমরা কীভাবে চলব?’
এ ঘটনা কে ঘটিয়েছে, সে অনুমানও করতে পারছেন না এই পুঞ্জির মান্ত্রী সুকমন আমসে। তিনি বলেন, ‘কে কেটেছে আমরা কিছুই জানি না। তবে বাইরে থেকে মানুষ এসে তো এই কাজ করবে না, হয়তো আমাদের প্রতিবেশীরাই হিংসায় পড়ে এমন কাজ করে থাকতে পারে।’ ২০১৫ সালে পানজুমের ২০০ পানগাছ কেটে দেওয়া হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘মাঝেমধ্যে আমাদের দুই-চার-দশটি করে পানগাছ কাটা হলেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি। তবে এবার খুব বড় ক্ষতি হয়ে গেল।’
ছোটলেখা চা-বাগানের বনাখলাপুঞ্জিতে পানগাছ কাটার মতো ঘটনা না ঘটলেও গত ২৬ মে সেখানকার খাসি পানচাষিদের ৭০ একর জুমের জায়গা দখল করে তাদের কাছে চাঁদা দাবি করেছিল স্থানীয় কিছু বাঙালি দুস্কৃতকারী। সেখানে তারা কয়েকটি ঘরও নির্মাণ করেছিল। পরে এ ঘটনায় মামলা হলে জুম দখলের সাত দিন পর গত ৪ জুন উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশ যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে পানজুমটি দখলমুক্ত করে খাসিদের বুঝিয়ে দেয়। পরিদর্শনে গেলে নাগরিক দলের কাছে নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন পানপুঞ্জির আদিবাসীরা। জায়গা দখলমুক্ত হলেও তারা সেখানে যেতে কিছুটা ভয় পাচ্ছেন। তাদের ধারণা, পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়ে এলে আদিবাসীদের জায়গা-জমি আবার দখল হয়ে যেতে পারে। তার ওপর প্রতিনিধি দলের সামনে দখলকারীদের নাম প্রকাশ করতেও ভয় পাচ্ছে তারা।
পুঞ্জির দখল হওয়া জায়গার মধ্যে ছয় একরের মালিক মালকিন সুমের। জমি ফিরে পাওয়ার পর কয়েক দিন ধরে জুমে যাচ্ছেন ভয়ে ভয়ে। তিনি বলেন, ‘তারা আমাদের জুমের বেশকিছু পান ছিঁড়ে নিয়ে গেছেন। এ ছাড়া কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে আমাদের জমির সীমানা নির্দিষ্ট করা ছিল, সেগুলো নষ্ট করেছে দখলকারীরা। আমরা খুব আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছি।’
পুঞ্জির নারী মান্ত্রী (পুঞ্জিপ্রধান) নরা ধার দখলের সঙ্গে জড়িতদের নিয়ে বলেন, ‘এসব জমি দখলের পেছনে কারা ছিল, আমরা জানি না। তবে এই ঘটনাগুলো আমাদের মনে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা জাগায়।’
এসব পুঞ্জি পরিদর্শনের পরে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান ও পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জাকারিয়ার সঙ্গে কথা বলে আদিবাসী খাসিদের সমস্যাগুলো সমাধানে সহায়তা চায় নাগরিক প্রতিনিধি দল। এ সময় আদিবাসী পানচাষিদের সমস্যা সমাধানে আশ্বাস দেন জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের সর্বোচ্চ এ কর্তাব্যক্তি। পরে দলটি মৌলভীবাজার প্রেস ক্লাবে একটি সংবাদ সম্মেলনে এসব পুঞ্জি পরিদর্শনোত্তর মতবিনিময় করে।
প্রতিনিধি দলে ছিলেন নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন কণা, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক দীপায়ন খীসা, প্রাণ-প্রকৃতি গবেষক পাভেল পার্থ, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ফারহা তানজীম তিতিল ও আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অলিক মৃ প্রমুখ।
সূত্র : সমকাল
The post জীবন-জীবিকার লড়াই করে যাচ্ছে তারা appeared first on বিডি২৪টাইম.কম | BD24TIME.COM.
Comments
Post a Comment