মেজর ডা.খোশরোজ সামাদ: বাবা দিবস, আমার নিঃসঙ্গ বাবা
মেজর ডা.খোশরোজ সামাদ: [১] বাবার পঞ্চান্ন বছরের জীবন সঙ্গী আমার মাকে করোনা ছিনিয়ে নেয়ার পয়লা বছর প্রায় ছুঁই ছুঁই করছে। মায়ের যখন করোনা হয় তখন বাবাও আক্রান্ত হন। দুজনই সিএমএইচে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। বাবা-মা দুজনই একই কেবিনে ছিলেন। মাকে আইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হলো। নিজের অসুস্থতার সঙ্গে যুদ্ধ করলেও মায়ের কথা শুনতে চাইতেন। তিনি ভালো আছেন, এটি বললে তিনি বলতেন, ‘আমায় মিছে সান্ত্বনা দিস না ’। বাবাকে যেদিন ডিসচার্জ করা হচ্ছে সেদিন মা মহাকালের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছেন। আমার চিকিৎসক বোন ডা. খুরশিদা সামাদ সবাতী তখন নিজেই কোভিডে ভুগে নিজ বাড়িতে আইসোলেটেড হয়ে নিজেই নিজের চিকিৎসা নিচ্ছে। আমার অনুজ ইঞ্জিনিয়ার খুররম সামাদ সৌরভ আর আমি একবার মর্চুয়ারি, একবার বনানী সামরিক কবরস্থানে মায়ের শেষ শয্যার আয়োজন করছি। চিকিৎসক হিসেবে সরাসরি এবং টেলিমেডিসিনে কতো মুমূর্ষু রোগীর চিকিৎসা করলাম। আরোগ্য নিয়ে হাসিমুখে কতোজন বাড়ি ফিরে গেলো। হতোভাগা আমি, নিজের মা-কেই বাঁচাতে পারলাম না। মহাকাব্যে লেখা কঠিনতম ট্র্যাজেডির নরক যন্ত্রণায় বিদ্ধ আমাদের পরিবার। ভয়াবহ কোভিড সিনড্রোমে ভোগা বাবাকে পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম সত্য জানানো হলো। আব্বার স্মিত চিরহাস্যমাখা মুখের আড়ালে অশ্রু আমরা তিন ভাইবোন দিব্যি দেখি। আড়ালে যাই। বুড়ো খুকু- খোকারা লুকিয়ে অশ্রু মুছি। পুনরায় কোভিড আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি এড়াতে চিকিৎসকের পরামর্শে আব্বা পঞ্চান্ন বছরের চাকরি ছেড়ে ১৫০০ বর্গফুটের নিজস্ব ফ্ল্যাটে যেন পরবাসী হয়ে গেলেন।
[২] বাবা সেই ষাটের দশকে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড থেকে অর্থনীতিতে সর্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জন করেন। ব্যাংকিং সেক্টরের অমিত সম্ভাবনার কথা বিশ্লেষণ করে দূরদর্শী বাবা শিক্ষানবিশ অফিসার হিসেবে ব্যাংকে নাম লেখান। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ট্রেনিং নেয়া ব্রাঞ্চ ম্যানেজার বাবা মুক্তিযুদ্ধের সময় ভল্টে রাখা চাবি আগলে রাখেন মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে। ডামাডোলের সেই দিনগুলিতে ভল্টে রাখা কোটি টাকা তসরুপের সহকর্মীদের শত প্রলোভনের বিরুদ্ধে লড়াই করেন আর্দশিক ভিত্তিভূমির ওপরে দাঁড়িয়ে। বিনিময়ে তস্করেরা আমাদের পুরো বাড়ি গান পাউডার দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। মা আর দুধের শিশুকে নিয়ে বাবা তার সাজানো সংসার দাউ দাউ করে পুড়ে যেতে দেখলেন। জাতি যখন নতুন পতাকা পেলো বাবা তখন কপর্দকশূণ্য। ৩. আমার হাতে খড়ি হলো বিএবিএড মায়ের হাতে। উঁচু ক্লাসে গণিত, ইংরেজিসহ জটিল বিষয়গুলোতে বাবা আমার শিক্ষক। সিলেবাসের বাহিরে পৃথিবীর পাঠশালাও আমার সামনে অবারিত করা হলো। সন্তানকে একই সঙ্গে সাহিত্য সুহৃদ এবং বিজ্ঞানমনস্ক করবার জটিল কাজটি বাবা সুনিপুণ কারিগরের হাত দিয়ে গড়লেন। [৪] স্কুল ফাইনাল দেয়ার সময় বাবা লীড ব্যাংকের প্রধান। টাংগাইল শহরের হাতে গোনা কয়েকটি গাড়ির একটি এবং শহরের সুরম্যতম বাড়ি ছিলো আমাদের। কিশোরমানসে আত্মসন্মান যেন আত্ম অহংকারে রুপ না নেয় সেটি বাবা পইপই করে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন।
[৫] মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা, চিকিৎসক হিসেবে সামরিক চাকুরি গ্রহণের ইচ্ছা আমার ওপর ছেড়ে দিলেও তিনি বলেন, সব পেশাই সন্মানের হলেও সততা নিয়ে চলবার জন্য সশস্ত্র বাহিনী শ্রেষ্ঠ কর্মস্থল। আমার ছোটবোন স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করলে একই সমাবর্তন অনুষ্ঠানে আমাদের সংবর্ধিত করা হয়। সম্ভবত আব্বাই একমাত্র ব্যক্তি যার পুত্র-কন্যা একই সঙ্গে সংবর্ধিত হন। আমার একমাত্র অনুজও বাবার দেখানো পথে হেঁটে বুয়েট থেকে প্রথম শ্রেণীতে স্নাতক, এমবিএ করবার পর একটি বহুজাতিক কোম্পানির কান্ট্রি ম্যানেজারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বিচক্ষণতার সঙ্গে পালন করছে। [৬] সন্তানের আবেগে নয়, চিকিৎসকের দৃষ্টিতে দেখে বলছি, কোভিড ছাড়া বাবাকে সারাজীবন বড় কোনো রোগে অসুস্থ হতে দেখিনি। বাবা এখনও ক্লিন শেভ করেন, পক্ককেশে দেখলে আমাদের হৈ চৈ- এর কাছে হার মানেন। [৭] বাবা দিবসে অনেকে বাবা-মা জড়িয়ে ছবিতে ফেসবুকের টাইমলাইন সয়লাব করে দেন। বাবাকে ফোন করে কুশল জিজ্ঞেস করলে বাবা নিজের ভয়াল নিঃসঙ্গতা লুকান। গর্বিত কন্ঠে জানান, তিনি খুব ভালো আছেন। সন্তানের সুখেই তিনি সুখী। বাবা, তুমিই আমাদের জীবনের রিয়েল হিরো। Dear Father, I hat of with profound regard, I salute you with tear.
লেখক পরিচিতি : ক্লাসিফাইড স্পেশালিষ্ট, বাংলাদেশ আর্মড ফোর্সেস।
The post মেজর ডা.খোশরোজ সামাদ: বাবা দিবস, আমার নিঃসঙ্গ বাবা appeared first on বিডি২৪টাইম.কম | BD24TIME.COM.
Comments
Post a Comment