বেসরকারি খাতের মন্দাভাব কিছুতেই যাচ্ছ না
নিউজ ডেস্ক: কমেছে ঋণের প্রবৃদ্ধি ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি, বেড়েছে টাকার প্রবাহ। বেসরকারি খাতে মার্চ পর্যন্ত হিসাবে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি কমেছে। সেইসঙ্গে কমেছে দেশে মূলধনী যন্ত্রাংশ আমদানিও। এতে শিল্প খাতসহ সমগ্রিক অর্থনীতির স্থবিরতা কাটছে না। তবে এ সময়ে বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মনিটারি পলিসি বিভাগের মাসিক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এমন আভাস দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনটি পাঠানো হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।
জানতে চাইলে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ (পিআরআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, অর্থনীতিতে স্থবিরতা হয়েছে সেটির প্রমাণ। এখানে সরকার বলছে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, সূচক বলছে না। তবে বিনিয়োগ এবং চাহিদা না বাড়লে এ পরিস্থিতি থেকে বের হওয়া যাবে না। তিনি আরও বলেন, সবকিছু নির্ভর করছে করোনা পরিস্থিতির ওপর। আর এজন্য টিকা নিশ্চিত করতে হবে। টিকাই হবে স্থায়ী সমাধান।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মার্চ- এ তিন মাসে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ দশমিক ৮৭ শতাংশ। অর্থাৎ এ সময়ে ঋণ কম নিয়েছে শিল্পোদ্যোক্তারা। যে কারণে প্রবৃদ্ধি কমছে দশমিক ৮ শতাংশ। তবে একই সময়ে বাজারে টাকার প্রবাহের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩ দশমিক ২১ শতাংশ। এটি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ১ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ।
সাধারণত ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়ে থাকে ব্যবসা-বাণিজ্য গতিশীল থাকলে। কারণ তখন বেসরকারি উদ্যোক্তারা প্রয়োজনে বেশি মাত্রায় ঋণ গ্রহণ করেন। কিন্তু করোনার মহামারিতে বিশ্বব্যাপী ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা চলছে। যার প্রভাব পড়েছে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে। মন্দা ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে চলতি অর্থবছরের রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা কাটছাঁট করা হয়েছে। মূলত এসব কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমেছে।
এ বিষয়ে চামড়া খাতের শিল্পোদ্যোক্তা ইব্রাহিম বলেন, করোনার দুটি ধাক্কার কারণে আমার শিল্পে বিদেশি ক্রেতারা তাদের অর্ডার কমিয়ে দিয়েছে। আগামী দিন কেমন যাবে, করোনায় ক্ষতি বাড়বে কিনা এসব পর্যবেক্ষণ করে স্বল্প পরিসরে অর্ডার দিচ্ছে কিছু ক্রেতা। এতে আমাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না। পাশাপাশি যে ক্ষতি হচ্ছে তা থেকে বেরিয়ে আসতে অনেক সময় চলে যাবে। কিন্তু এরপরও কারখানা যেন বন্ধ না হয় সে জন্য সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। অর্থনীতির আরও একটি সূচক মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি। মূলত নতুন নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি বৃদ্ধি পায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ- এ ৯ মাসে বিদেশ থেকে মূলধনী যন্ত্রাংশ আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয়েছে ২৮ হাজার ১৬০ কোটি টাকার। গত বছর একই সময়ে এলসি খোলা হয় ৩৪ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকার। অর্থাৎ এ সময় শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কম হয়েছে ৬ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা। এলসি খোলার ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি কমছে ১৯ দশমিক ৯২ শতাংশ।
ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মূলধনী যন্ত্রাংশ এলসি নিষ্পত্তির হারও কমছে। দেখা গেছে জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়েছে ২২ হাজার ৯৯৫ কোটি টাকা। গত বছর একই সময় এ নিষ্পত্তির হার ছিল ৩০ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা। মূলধনী যন্ত্রপাতি এলসি নিষ্পত্তি কম হয়েছে ৭ হাজার ৮শ কোটি টাকা। এ খাতে প্রবৃদ্ধি কমছে ২৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
জানা গেছে, করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা কমেছে। আবার নতুন নতুন কারখানা স্থাপিত হচ্ছে না। ফলে শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির পরিমাণও কমেছে। শিল্পোদ্যোক্তাদের মতে, ২০২০ সালের মার্চ থেকে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়া শুরু হয়। মাঝে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হলে অর্থনীতি ইতিবাচক ধারায় ফিরতে থাকে। কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টাতে থাকে। এ অবস্থা দীর্ঘদিন চললে অর্থনীতিতে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে বলে তারা মনে করছেন। এরই মধ্যে শিল্পাঞ্চল পুলিশের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, করোনা শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৬৩০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আর বেশিরভাগই হচ্ছে ঢাকা, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও খুলনায়। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) ১৩০টি, বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) ৭২টি, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) ২৩টি। দেশের অন্য জেলায় কত কারখানা বন্ধ হয়েছে, তার হিসাব পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এমনিতেই বেশ কিছুদিন ধরে বিনিয়োগে স্থবিরতা চলছে। জিডিপির ৩১-৩২ শতাংশে আটকে আছে বিনিয়োগ। এখন ভবিষ্যতে বিনিয়োগের অবস্থা আরও খারাপ হবে। আর বিনিয়োগ কমা মানে কর্মসংস্থান কমে যাওয়া। তবে এখন বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য শুধু বড় উদ্যোক্তাদের প্রণোদনার ঋণ দিলে হবে না, ছোট-মাঝারি-ক্ষুদ্র সব শ্রেণির উদ্যোক্তারা যেন এর সুফল পান, তা নিশ্চিত করার বিষয়টি বিভিন্ন মহল থেকে সুপারিশ ও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে সরকারকে।
সূত্র: যুগান্তর
The post বেসরকারি খাতের মন্দাভাব কিছুতেই যাচ্ছ না appeared first on বিডি২৪টাইম.কম | BD24TIME.COM.
Comments
Post a Comment