জাতিসংঘের প্রতিবেদন: দেড় বছরে অবৈধ পথে ইউরোপে গেছে সাড়ে ৫ হাজার বাংলাদেশী
নিউজ ডেস্ক: নভেল করোনাভাইরাসজনিত মহামারীতে গত বছর থেকেই গভীর সংকটে পড়েছে গোটা বিশ্ব। সংক্রমণ ঠেকাতে বিভিন্ন মেয়াদে সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করেছে প্রতিটি দেশই। তবে শত কড়াকড়িতেও থেমে নেই অবৈধ পথে ইউরোপে অভিবাসনের প্রচেষ্টা। সংক্রমণের ভয় উপেক্ষা করেই গত দেড় বছরে ইউরোপে অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা করেছেন ৫ হাজার ৩৬০ জন বাংলাদেশী। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টায় বাংলাদেশীদের অবস্থান বর্তমানে বিশ্বে চতুর্থ।
জাতিসংঘ বলছে, করোনাকালে মহামারী ঠেকাতে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় শ্রমিক নিয়োগ ও অভিবাসন ব্যবস্থাপনা করছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। বৈধভাবে প্রবেশের ক্ষেত্রে এখন বেশ কড়াকড়ি আরোপ করেছে ইউরোপের দেশগুলো। ইউএনএইচসিআরের তথ্য বলছে, লকডাউন আর প্রবেশে কড়াকড়ি থাকলেও ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধ প্রবেশের চেষ্টায় থাকা এসব মানুষের প্রধান গন্তব্য ইউরোপের দেশগুলো। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অংশ যায় লিবিয়া থেকে। অন্যান্য দেশের তুলনায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয়ার কাতারে প্রথম সারিতে আছেন বাংলাদেশীরাই। আর এ কাজ করতে গিয়ে প্রাণ হারানোর সংখ্যা বাড়তে থাকায় বিষয়টি নিয়ে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ।
সম্প্রতি প্রকাশিত ইউএনএইচসিআরের পরিচালন তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ৫ হাজার ৩৬০ জন বাংলাদেশীকে ভূমধ্যসাগর থেকে উদ্ধার করেছে সংস্থাটি। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি তিউনিসিয়ার নাগরিক উদ্ধার করা হয়েছে। যার সংখ্যা ১৪ হাজার ৬৪৯। এর পরই রয়েছে আলজেরিয়ার ৯ হাজার ৪৬৬ জন ও মরক্কোর ৫ হাজার ৩৯৯ জন। সংখ্যার বিচারে বাংলাদেশের অবস্থান ৪ নম্বরে। এছাড়া এ অঞ্চল থেকে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টায় শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সিরিয়া, আফগানিস্তান, আইভরিকোস্ট ও মালি।
২০১৫ সাল থেকে ইউরোপে অবৈধ অভিবাসনে সবচেয়ে আকর্ষণীয় রুট হয়ে উঠেছে লিবিয়া। দেশটিতে বর্তমানে বৈধ-অবৈধ কয়েকটি শাসন ব্যবস্থা ও যুদ্ধ পরিস্থিতি থাকার কারণে সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বেশ ঢিলেঢালা। এ সুযোগেই লিবিয়াকে প্রবেশপথ হিসেবে ব্যবহার করে ইউরোপের বিভিন্ন গন্তব্যে যাচ্ছে মানুষ। যদিও এ পথে ঝুঁকি অনেক বেশি নিতে হয়। ১০ শতাংশের ক্ষেত্রে ভিন্ন ঘটনা ঘটলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশে সক্ষম হন বাংলাদেশীরা। ইউরোপ প্রবেশের জন্য এসব বাংলাদেশীকে পাড়ি দিতে হয় ভূমধ্যসাগর।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ভূমধ্যসাগর থেকে উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশীদের সিংহভাগেরই লক্ষ্য ইতালি। প্রথম ধাপে লিবিয়া যেতে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ পর্যন্ত কয়েকটি সংঘবদ্ধ চক্র কাজ করে। ইউরোপে প্রবেশের আগে অন্য দেশ থেকে বাংলাদেশীদের উদ্ধার হওয়ার ঘটনাও রয়েছে। পরবর্তী সময়ে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তাদের ফেরত নিয়ে আসতে হয়।
এ প্রসঙ্গে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন বিভাগের প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, ইউরোপে অবৈধভাবে প্রবেশের ক্ষেত্রে অন্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের নাম আসায় তা আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। মধ্য আয়ের দেশসহ বিভিন্নভাবে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং করা হলেও যুদ্ধ চলমান দেশগুলোর মানুষের অবৈধভাবে প্রবেশের সঙ্গে বাংলাদেশীরা কেন প্রবেশ করছে, আন্তর্জাতিক ফোরামে তার উত্তর দিতে আমাদের বেগ পেতে হয়। তিনি বলেন, গত এক যুগে প্রায় ৫৫ হাজার বাংলাদেশী অবৈধভাবে ইতালি প্রবেশ করেছেন।
জানা গেছে, কয়েকটি পথ ধরে লিবিয়া হয়ে ইউরোপে প্রবেশ করেন বাংলাদেশীরা। এর প্রথমটি হলো ঢাকা থেকে দুবাই হয়ে লিবিয়া। তারপর সেখান থেকে ইউরোপ। দ্বিতীয়টি হলো তুরস্ক হয়ে সরাসরি ইউরোপ প্রবেশের চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে আবার লিবিয়া হয়ে যাওয়ার চেষ্টা। আরেকটি হলো দক্ষিণ সুদানের মরুভূমি থেকে লিবিয়া হয়ে ইউরোপ প্রবেশ।
এ পথগুলো দিয়ে গমনেচ্ছুদের ঢাকা পার করার সময় একটি চক্রের অধীনে রাখা হয়। এরপর দুবাই বা ইস্তানবুল অথবা সুদানে তাদের হস্তান্তর করা হয় দ্বিতীয় চক্রের হাতে। সেখান থেকে উড়োজাহাজে করে লিবিয়া যাওয়ার পর তৃতীয় চক্রের হাতে যান বাংলাদেশীরা। সেখান থেকে নৌকায় উঠিয়ে দেয়ার পর চতুর্থ চক্র ও সর্বশেষ ইউরোপ নেমে পঞ্চম চক্রের হাতে পড়েন বাংলাদেশীরা। এ পথগুলো দিয়ে লিবিয়া পৌঁছতে জনপ্রতি ৫ থেকে ৯ লাখ টাকা করে খরচ করতে হয়। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সব স্থানে অর্থ পরিশোধ করা না হলে অভিবাসন প্রত্যাশীদের মুক্তিপণ ও অপহরণের মতো ঘটনাও ঘটে। আবার কখনো কখনো মানব পাচারকারী চক্রের হাতে নির্দয়-নিষ্ঠুর পরিণতি বরণ করে নিতে হয় অভিবাসন প্রত্যাশীদের।
ইউএনএইচসিআরের গত মার্চের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালের প্রথম তিন মাসের তুলনায় ২০২১ সালের প্রথম তিন মাসে লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয়ার হার বেড়েছে ৫৪ শতাংশ। গত বছরের তুলনায় লিবিয়া উপকূল থেকে ইতালি যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে ১৪৩ শতাংশ। গত বছর সাড়ে চার হাজার শরণার্থী লিবিয়া থেকে ইতালি গেলেও এ বছর তিন মাসে গেছেন প্রায় দেড় হাজার। এ বছর সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইতালি প্রবেশকৃতদের মধ্যে ৬১ শতাংশই লিবিয়া থেকে এসেছে। পাশাপাশি লিবিয়া থেকে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশী ইতালি ও মাল্টায় প্রবেশ করেছেন, সংখ্যায় যা ৭৯৪। এ তালিকায় অন্যান্য দেশের মধ্যে আছে সুদানের ৪১৮ জন, গিনির ৪১৬, ইরিত্রিয়ার ৩৭২, আইভরিকোস্টের ৩৪৮, মালের ২৯৬, মিসরের ২৭৬, মরক্কোর ২১৮, ক্যামেরুনের ১৮২ ও সোমালিয়ার ১৩৮ জন। এ তালিকায় থাকা বাংলাদেশীরা সবাই ইতালি গেছেন বলে জানায় ইউএনএইচসিআর।
আন্তর্জাতিক অভিবাসনবিষয়ক সংস্থা আইওএম বলছে, এ বছরের ২০ মে পর্যন্ত ৭৪৩ জন ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। সংস্থাটির তথ্য থেকে আরো জানা যায়, গত বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয়ার সংখ্যা ছিল ২০ হাজার ১১ জন, এ বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৭৩৪ জনে। গত বছর পাঁচ মাসে ২৯০ জন মারা গেলেও এ বছর মারা গেছেন ৭৪৩ জন।
The post জাতিসংঘের প্রতিবেদন: দেড় বছরে অবৈধ পথে ইউরোপে গেছে সাড়ে ৫ হাজার বাংলাদেশী appeared first on বিডি২৪টাইম.কম | BD24TIME.COM.
Comments
Post a Comment