জান্নাতুল ফেরদৌস পান্না: ‘তামাকমুক্ত দেশ গড়তে আইন সংশোধনের বিকল্প নেই’

জান্নাতুল ফেরদৌস পান্না: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৬ সালের ৩০ জানুয়ারি ‘সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল (এসডিজি)র আয়োজনে হোটেল সোনারগাঁয়ে অনুষ্ঠিত দুইদিনব্যাপী দক্ষিণ এশিয়া স্পিকার্স সম্মেলনের শেষ দিনেঘোষণা দেন, আগামী ২০৪০ সালের মধ্যে তামাক মুক্ত দেশ হবে। এ ঘোষণাটি অতটাই যুগোপযোগী ও প্রাসঙ্গিক ছিলো যে, তামাকবিরোধী সকল সংস্থাসহ সর্বক্ষেত্রে তা প্রশংসিত হয়। পৃথিবীর ইতিহাসেও বিষয়টি রীতিমতো নজির স্থাপন করে। কারণ এর আগে কোনো দেশের কোনো সরকার প্রধান তামাক নির্মূলে এমন নির্দিষ্ট টাইম ফ্রেমের ঘোষণা দেননি। যা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিয়েছেন’। প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষনার প্রেক্ষিতে দেশের বিশিষ্টজনেরা নানান মতামত দেন।

আহমেদ উল্লাহ, কিশোরগঞ্জের একজন সিনিয়র সাংবাদিক, সংগঠক ও রাজনৈতিক। তিনি বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত দেশ গড়তে আইন সংশোধনের উপর গুরুত্বারোপ করে বলেছেন, আমরা যারা তামাকের সঙ্গে জড়িত না। তারাও পরোক্ষভাবে ধুমপান নামক বিষ পান করছি। তিনি জানান, কিশোরগঞ্জ শহরের প্রত্যেকটি স্থানে উন্মুক্তভাবে তামাকজাত পণ্য বিপণন ও বাজারজাতকরণ করা হচ্ছে। এটা এক ধরনের সহজাত প্রবৃদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ এভাবেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তিনি মনে করেন বিদ্যমান আইনের প্রয়োগ বাড়াতে হবে। সেইসঙ্গে কিছু কিছু জায়গায় আইনের সংশোধন আনতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আ্ইনজীবী মনজিল মোরশেদ এ প্রতিবেদককে জানান, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের তো কোন প্রয়োগই নাই। যে আইন আছে তারই প্রয়োগ নাই। আইন সংশোধন করলে যে সেটির প্রয়োগ বাড়বে তিনি তা মনে করেন না। তিনি বলেন, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের দৃঢ় সদিচ্ছা থাকতে হবে। তবেই প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণাটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

ঢাকা আহসানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য ও ওয়াস সেক্টরের পরিচালক ইকবাল মাসুদ এই প্রতিবেদককে বলেন, বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার হিউম্যান কনভেনশন অন টোবাকো কন্ট্রোলের এফসিটিসির সাথে বিদ্যমান আইনটির অনেক অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। এ দেশের প্রেক্ষাপটে যে ধরনের আইন করা উচিত, যে ধরনের আইন করলে তামাককে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, যে সকল বিষয়গুলো বিদ্যমান আইনে নেই সে ধরনের আইন প্রণয়ন করতে সুপারিশ করেছি।

এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ কে এম লুৎফর রহমান আজাদ বলেন, যারা তামাক সেবন করে তাদেরকে শাস্তি না দিয়ে সংশোধন হওয়ার জন্য সরকারিভাবে সংশোধনাগার তৈরী করে সংশোধনাগারে পাঠানো যেতে পারে। সরকার ঘোষিত ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত দেশ গড়তে তিনি তামাক উৎপাদন, বিক্রয়, বিপণন, সেবন সব কিছু বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষে মত দেন।

কিশোরগঞ্জ কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এড. এবিএম লুৎফর রশিদ বিদ্যমান আইন প্রসঙ্গে বলেন, বিদ্যমান আইনটি খুবই দুর্বল। এই আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি ২০০ টাকা জরিমানা, অথবা এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড। সাধারণত এই আইনে ৫০ টাকা জরিমানা ধরা হয়। যা একবারেই অপ্রতুল। এই আইনটিকে কঠোর করতে হবে। তিনি মনে করেন কর্মক্ষেত্রে, রেস্তোঁরাসহ সব পাবলিক প্লেসকে শতভাগ ধুমপানমুক্ত করা গেলে সেখানে আগতদের হৃদরোগের ঝুঁকি ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাবে, শ্বাসতন্ত্র ভালো থাকবে এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি হ্রাস পাবে।

গ্লোবাল এডাল্ট ট্যোবাকো সার্ভে (গ্যাটস)’র ২০১৭ সালের রিপোর্টে তামাক ব্যবহারের বেশ কিছু বিষয় উঠে এসেছিল। ওই রিপোর্ট মোতাবেক, তামাক ব্যবহারকারীর প্রায় অর্ধেক মারা যান তামাকের কারণে। আর বিশ্বজুড়ে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর প্রধান ৮টি কারণের ৬টির সাথেই তামাক জড়িত। তামাক ব্যবহারকারীদের তামাকজনিত রোগ যেমন হৃদরোগ, স্ট্রোক, সিওপিডি বা ফুসফুসের ক্যান্সার হবার ঝুঁকি ৫৭ শতাংশ বেশি এবং তামাকজনিত অন্যান্য ক্যান্সার হবার ঝুঁকি ১০৯ শতাংশ বেশি। একারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর ১ লক্ষ ৬১ হাজারেরও বেশি মানুষ তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার জনিত রোগে মৃত্যুবরণ করেন। ৎ

প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে ৩৫ শতাংশ তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার করেন। সংখ্যার হিসেবে যা সাড়ে ৩ কোটিরও বেশি। আবার ১৩ থেকে ১৫ বছরের অপ্রাপ্তবয়স্করাও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার থেকে পিছিয়ে নেই। শতকরার হিসেবে সেটিও প্রায় ৬ দশমিক ৯ ভাগ।
যারা ধুমপান করেন না, কিন্তু পরোক্ষভাবে ধুমপানের ক্ষতির শিকার হন, এমন মানুষের সংখ্যা সামগ্রিক ভাবে মোট ধুমপায়ীর সংখ্যার চেয়েও বেশি। সংখ্যার হিসেবে তা প্রায় ৪ কোটি মানুষ, যা প্রত্যক্ষ ধুমপায়ীর চেয়ে বেশি।

তবে বাংলাদেশে ধুমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ফলে তামাক নিয়ন্ত্রণে বেশ অগ্রগতি হয়েছে। ২০০৯ ও ২০১৭ সালে পরিচালিত গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে হতে সেটি দেখা যায়। ২০০৯ সালের চেয়ে বর্তমানে তামাকের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে ১৮.৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে (রিলেটিভ রিডাকশন)। এক্ষেত্রে ধুমপানের ক্ষেত্রে ২২শতাংশ তুলনামূলক হ্রাস এবং ধোঁয়াবিহীন তামাকের ব্যবহারে ২৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি সত্ত্বেও তামাক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩৫ লাখ কমেছে।

বিভিন্ন পাবলিক প্লেসে পরোক্ষভাবে ধুমপানের হার, যেমন: রেস্তোঁরায় ৩০ শতাংশ, কর্মক্ষেত্রে ১৯ শতাংশ, হাসপাতালে ১১ শতাংশ এবং গণপরিবহনে প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে, যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।

এ বিষয়ে গত বছরের ২ মে ‘স্থানীয় পর্যায়ে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নে করণীয়’ শীর্ষক ওয়েবিনারে বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোটের সমন্বয়কারী সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, তামাক কোম্পানিগুলো অন্যসময়ের তুলনায় আরো বেশি আগ্রাসী রুপ ধারণ করেছে। সুতরাং স্থানীয় পর্যায়ে জোটভুক্ত সংগঠনগুলোকে আরো বেশি সক্রিয় হতে হবে। এনটিসিসির সুনিদিষ্ট নির্দেশনা ও সহায়তা এ ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

The post জান্নাতুল ফেরদৌস পান্না: ‘তামাকমুক্ত দেশ গড়তে আইন সংশোধনের বিকল্প নেই’ appeared first on বিডি২৪টাইম.কম | BD24TIME.COM.

Comments

Popular posts from this blog

আইপিএলসহ টিভিতে আজকের খেলার সূচি

ঈদুল ফিতরে বেপরোয়া অটোরিকশা: খোকসায় দুর্ঘটনায় আহত ২: প্রতিকার চায় স্থানীয়রা

সৌদি রিয়াল রেট বিনিময় হারের বিশাল লম্বা লাফ ( ৩ এপ্রিল ২০২৫)

নীলফামারীতে ঈদের পরে শহরের সার্বিক নিরাপত্তা ও আইশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর নিরলস পরিশ্রম

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বনাম মানুষের কাজ: চাকরি হারাতে পারে যারা

বাংলাদেশে আজ ১৮ ক্যারেট, ২১ ক্যারেট, ২২ ক্যারেট সোনা ও রুপার দাম (২৭ মার্চ ২০২৫)

সৌদি রিয়াল রেট বিনিময় হারের বিশাল পতন (৩১ মার্চ ২০২৫)

৩ মে ঢাকায় সমাবেশ ডেকেছে হেফাজত ইসলাম বাংলাদেশ

বাংলাদেশে আজ ১৮ ক্যারেট, ২১ ক্যারেট, ২২ ক্যারেট সোনা ও রুপার দাম (৩১ মার্চ ২০২৫)

অবসরপ্রাপ্ত সেনা কল্যাণ সমিতি, তালা, সাতক্ষীরা-এর উদ্যোগে একাত্তরের বীর শহীদদের স্মরণে দোয়া ও ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত