আওয়ামী লীগের অনেক থানা ও ওয়ার্ড শাখার নেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি
সমকাল: ঢাকা মহানগরে সাংগঠনিকভাবে অগোছাল হয়ে পড়েছে আওয়ামী লীগ। কারণ অনেক থানা ও ওয়ার্ড শাখার নেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি। পাঁচ থেকে ১৪ বছর ধরে শুধু সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের তত্ত্বাবধানে সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে, এমন কমিটি অসংখ্য। আবার কোনো কোনো কমিটির সভাপতি অথবা সাধারণ সম্পাদকের মৃত্যু ঘটেছে। ফলে সেটি পরিণত হয়েছে ‘এক নেতার সংগঠনে’।
কয়েক বছর আগে পূর্ণাঙ্গ হওয়া কমিটিগুলোতে বিএনপি-জামায়াত, ফ্রিডম পার্টির নেতাকর্মীসহ নানা অপকর্মে যুক্ত ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশ ঘটানোর অভিযোগ রয়েছে মহানগর ও থানা নেতাদের বিরুদ্ধে। থানা-ওয়ার্ডে এমন বিতর্কিত নেতার সংখ্যাও কম নয়, যাদের বিরুদ্ধে রয়েছে অনুগতদের নিয়ে ‘পকেট কমিটি’ বানিয়ে দখল, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসাসহ অপকর্ম চালানোর অভিযোগ।
এদিকে মহানগরীর উত্তর ও দক্ষিণ অংশে দলের প্রাথমিক সদস্য সংগ্রহ ও সদস্যপদ নবায়ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। মহানগর উত্তরে ২৭টি টিমের মাধ্যমে এ কার্যক্রম চলবে। আটটি সংসদীয় এলাকায় আটটি সাংগঠনিক কমিটি গঠনের মাধ্যমে এ কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন মহানগর দক্ষিণের নেতারা।
২০১৯ সালের ৩০ নভেম্বর ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের সম্মেলন হয়। সম্মেলনে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়। প্রায় এক বছর পর গত বছরের ১৮ নভেম্বর ঘোষণা করা হয় এগুলোর পূর্ণাঙ্গ কার্যনির্বাহী কমিটি। তবে প্রায় দুই বছরেও কোনো থানা ও ওয়ার্ড সম্মেলন অথবা নতুন কমিটি গঠিত হয়নি। ২০১৬ সালে ঘোষিত থানা-ওয়ার্ড নেতারাই পালন করছেন সাংগঠনিক দায়িত্ব।
প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ১০ এপ্রিল অবিভক্ত ঢাকা মহানগরকে উত্তর ও দক্ষিণে বিভক্ত করে দুই অংশের পাশাপাশি সব থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করা হয়। পরে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত আটটি করে মোট ১৬টি ইউনিয়নকে ৩৬টি ওয়ার্ডে পরিণত করা হয়। নবগঠিত এই ৩৬টি ওয়ার্ডে সাবেক ইউনিয়ন নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
নেতারা বলছেন, পাঁচ বছর আগে গঠিত থানা-ওয়ার্ড কমিটির অনেক নেতাই দলের মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের কার্যনির্বাহী কমিটিতে স্থান পেয়েছেন। ফলে কোথাও কোথাও থানা-ওয়ার্ড কমিটি চালাতে হচ্ছে ‘ভারপ্রাপ্ত কমিটি’ দিয়ে। কোথাও কোথাও থানা-ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করায় এ পদগুলোও শূন্য রয়েছে।
অন্যদিকে, দীর্ঘদিনেও নতুন সম্মেলন ও কমিটি না হওয়ায় থানা-ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতৃত্বপ্রত্যাশী ত্যাগী ও দক্ষ নেতারা হতাশ হয়ে সাংগঠনিক কার্যক্রমে প্রায় নিষ্ফ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। আবার দীর্ঘদিন পদে আসীন থাকায় অনেক নেতার মধ্যে ‘আয়েশি ভাব’ চলে এসেছে।
পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়েও অভিযোগ :ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগে সাংগঠনিক থানা ২৬টি, ওয়ার্ড ৬১টি এবং ইউনিয়ন একটি। অভিযোগ, ২০১৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতাদের অজ্ঞাতসারে ও তাদের স্বাক্ষর ছাড়াই সব থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিয়নের পূর্ণাঙ্গ কমিটির অনুমোদন দেন মহানগর উত্তরের তৎকালীন সভাপতি এ কে এম রহমত উল্লাহ ও তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান।
এ সময় পূর্ণাঙ্গ কমিটিগুলোতে ত্যাগী ও দক্ষ নেতাদের বাদ দিয়ে অর্থের বিনিময়ে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ফ্রিডম পার্টির নেতাকর্মী ছাড়াও সন্ত্রাসী-জঙ্গি, চাঁদাবাজ-টেন্ডারবাজ, মাদক ব্যবসায়ীসহ বিতর্কিতদের ঠাঁই করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিক্ষুব্ধ স্থানীয় নেতারা এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ দেন। তৃণমূলের নেতাদের এমন অভিযোগের পর সব পূর্ণাঙ্গ কমিটি স্থগিত করেন প্রধানমন্ত্রী। যদিও এসব পূর্ণাঙ্গ কমিটির নেতারা এখনও পদ-পদবি ব্যবহার করছেন। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে নানা অপকর্ম চালানোর অভিযোগও রয়েছে।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক থানা ২৪টি এবং সাংগঠনিক ওয়ার্ড ৭৫টি। এর মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি রয়েছে ১২টি থানা ও ২৮টি ওয়ার্ডের। বাকি থানা ও ওয়ার্ড কমিটি চলছে শুধু সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দিয়ে। কোনো কোনো কমিটির সভাপতি অথবা সাধারণ সম্পাদকের মৃত্যু ঘটেছে। আবার কোনো কোনো থানা-ওয়ার্ড নেতা মহানগর দক্ষিণের কমিটিতে চলে আসায় শূন্য হয়ে পড়েছে সেসব পদ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের বৃহত্তর ডেমরা ও পরে যাত্রাবাড়ী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি হয়েছিলেন কাজী মনিরুল ইসলাম মনু। কিন্তু গত ১৪ বছরেও কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে পারেননি তিনি। এ থানার ওয়ার্ড কমিটিগুলোর বয়সও এক যুগের বেশি।
একইভাবে প্রায় পাঁচ বছর আগে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের। লালবাগ থানা আওয়ামী লীগ সভাপতি হাজি দেলোয়ার হোসেন মারা যাওয়ায় সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাচ্ছেন শুধু সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান জামাল। ক্যাসিনোকাণ্ডে নাম আসার পর পল্টন থানা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোস্তবা জামান পপি আত্মগোপনে থাকায় এ থানার কার্যক্রম চলছে সভাপতি এনামুল হক আবুলের মাধ্যমে।
পুনর্গঠন কার্যক্রমেও বেহাল দশা :ঢাকা মহানগরের থানা-ওয়ার্ড, ইউনিট পর্যায়ের সম্মেলন ও নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের তাগিদ দেওয়া হচ্ছে বেশ আগে থেকেই। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও দ্রুততম সময়ে সম্মেলন কার্যক্রম শুরু করতে মহানগর নেতাদের বারকয়েক হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। কেন্দ্র থেকেও কয়েকবার সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। তার পরও পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু হয়নি।
শিগগির ঢাকা মহানগরের তৃণমূল সম্মেলন শুরুর কথা জানিয়ে দলের ঢাকা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম বলেছেন, সম্মেলন আয়োজন বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের সময় বেঁধে দেওয়া হবে। অনুপ্রবেশ সংকট নিরসন প্রশ্নে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও নির্দেশনা আছে অনুপ্রবেশকারী ও হাইব্রিড কিংবা দলের ইমেজ নষ্টকারী ব্যক্তিদের দল থেকে বিতাড়িত করার। এ প্রক্রিয়ায় হয়তো এই মুহূর্তে বিতর্কিতদের দল থেকে বহিস্কার করা হচ্ছে না; কিন্তু যখনই সম্মেলন হবে, তখন বিতর্কিত ব্যক্তিদের দল থেকে ঝেড়ে ফেলা হবে।
আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান কচি, মহানগর দক্ষিণের সভাপতি আবু আহমেদ মন্নাফী ও সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির অভিন্ন ভাষায় বলেন, করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে সাংগঠনিক কার্যক্রম ব্যাহত হলেও তারা মহানগরীর অসহায় ও দুস্থ মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় তাদের পাশে রয়েছেন। মহামারির মধ্যেও চেষ্টা করছেন মহানগরে দলকে পুনর্গঠিত ও শক্তিশালী করার। এ লক্ষ্যে নগরে সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রম অব্যাহত রাখা ছাড়াও ওয়ার্ড-থানা-ইউনিট সম্মেলন শেষ করার প্রস্তুতি রয়েছে। নতুন নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বিতর্কিত ব্যক্তি, সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজ ও মাদকসম্পৃক্তদের কোনো কমিটিতে জায়গা দেওয়া হবে না বলেও জানান তারা।
The post আওয়ামী লীগের অনেক থানা ও ওয়ার্ড শাখার নেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি appeared first on বিডি২৪টাইম.কম | BD24TIME.COM.
Comments
Post a Comment