মাহবুবুর রহমান: শর্তহীন ভালবাসা ও ত্যাগ

মাহবুবুর রহমান, ডেনমার্ক থেকে: আব্বা হচ্ছে স্নেহচ্ছায়া বটবৃক্ষের মতো,যিনি আমাদের পরিবারের ভালোর জন্য নিদ্বিধায় সবকিছুই ত্যাগ করতে পারতেন।যে আব্বার কারনে এই পৃথিবীর রুপ-রং ও আলোর দর্শন পেয়েছি আমরা।আব্বা আমাদের শিখিয়েছেন এই কঠিন প্রতিযোগিতার পৃথিবীতে কিভাবে মাথা উচুঁ করে টিকে থাকতে হয়।

আব্বা আজ আমাদের মাঝে নাই।এখন বটবৃক্ষের ছায়ার মতো আমাদের পরিবারের পার্শ্বে দাঁড়ানোর কেউ নেই। তবুও আব্বা আমাদের সংগে থাকেন প্রতিমুর্হুতে প্রতিক্ষণে আমাদের অনুভবে ও বিশ্বাসে।আমার কাছে আমার আব্বা পৃথিবীর শ্রেষ্ট একজন মানুষ ছিলেন,কারন তিনি ছিলেন অত্যান্ত ভাল মানুষ ও আর্দশবান ব্যক্তি ।

আব্বার সততার শক্তি আর ভালবাসা এখনও আমাদের একান্নবর্তী পরিবারকে একসাথে রেখেছে এবং কানায়-কানায় ভরিয়ে রেখেছে সুখ ও সমৃদ্ধি দিয়ে।

আদি ফ্যাশনের যুগে আমার আব্বা চিন্তা চেতনায় ছিলেন আধুনিক ও কঠোর পরিশ্রমী ও সংগ্রামী একজন মানুষ।আমরা ৬ ভাই ও ৪ বোনের সংসার,অতি সাধারন ভাবে মধ্যবিত্ত পরিবারের বেড়ে উঠেছি। গ্রামের মানুষ যখন বিঘা বিঘা জমি ক্রয় করা নিয়ে প্রতিযোগীতায় ব্যস্ত ,তখন আমার আব্বা জমি বিক্রি করে আমাদের পড়ালেখার খরচ যুগিয়েছেন।এটা নিয়ে গ্রামের মানুষদের কানাঘুষা করতেও দেখেছি।

আব্বা বিশ্বাস করতেন, সন্তানদের ভাল পড়ালেখা করানোর মাধ্যমে এক একজন সন্তানই তাঁর বড় সম্পদ ও সম্পত্তি।
শৈশবের কথা মনে হলে আব্বার প্রতিচ্ছবি আমি দেখতে পাই,যিনি প্রতি মুহূর্তই সংগ্রাম করে গিয়েছেন অপরাজিত সৈনিকের মতো।

প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন আব্বা,শিক্ষক হিসাবে উনি যে বেতন পেতেন তা দিয়ে দশ ভাইবোনের সংসার ও পড়াশুনার খরচ মেটানো অসম্ভাব ছিল।যদিও আমাদের বেশ জমি-জমা থাকার কারনে খাদ্য ও খাদ্য সামগ্রীর জন্য বেশী সমস্যায় পড়তে হয়নি।

অতিরিক্ত উপার্জন বাড়ানোর জন্য গ্রামের ফড়িয়াদের কাছে থেকে পাট সংগ্রহ করে মাথাভাংগা নদী দিয়ে সেই পাট নৌকায় যশোরে পাঠাতেন।

দিনরাত পুরো সময়টা কাজে লাগানোর জন্য রাত্রিকালীন সময়টা আব্বাকে দর্জির কাজ করতে দেখেছি।বড় ভাই হাউজিং এ চাকুরী পাওয়ার পরে পারিবারিক চাপে দর্জির কাজটি বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিলেন আব্বা।

আমার বড় বোনের বিয়ের সময় দুলাভাইয়ের বাবাকে ছয় হাজার টাকা যৌতুক দিতে হয়েছিল।এই যৌতুকের টাকা হস্তান্তরের সময় আব্বাকে হওমাও করে কান্না করতে দেখেছি।পরে আব্বাকে জিজ্ঞেস করেও উত্তর পায়নি,শুধু বলেছিলেন যৌতুক ভাল জিনিস না।

আমরা তিন ভাই বোন বড় ভাইয়ের বাসায় থেকে পড়ালেখা করছি।কুষ্টিয়া থেকে নতুন শ্যামলী পরিবহনে ঢাকায় এসেছিলাম আব্বার সাথে।আব্বা আমাদের দুইভাইকে বড় ভাইয়ের বাসায় রেখে কুষ্টিয়া ফিরে যাওয়ার সময় কান্না করছিল যা এখনও মনে পড়ে ।সেইসময় আমি পড়ি ক্লাস সিক্সে আর ছোট ভাই পন্টু ক্লাস ফোরে।আমার ছোট ভাই পন্টু ববারবই আমার চেয়ে স্মার্ট ও চালাক ছিল, অন্যদিকে আমি ছিলাম একটু বোকাসোকা গাধা টাইপের, এইজন্য আমাকে অবশ্য অনেকবার মার ও বকাও খেতে হয়েছে।

আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে,বড়বোন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে,ছোট ভাই রাজশাহী বিআইটিতে,আর একজন কলেজে,ছোট বোন বেনু স্কুলে সব মিলিয়ে বিরাট পড়ালেখার খরচ, একজন স্কুল মাষ্টারের পক্ষে কুলিয়ে উঠা সম্ভব ছিল না।এই সময় বড় ভাই অবশ্য আব্বার পার্শ্বে দাঁডিয়ে ছিল তাঁরপরও আব্বাকে অতিরিক্ত উপার্জনের জন্য দোকানদারীর কাজ চালু করতে হয়েছিল।
এখনও আমার খেয়াল হয় একবার কোরবানীর ঈদে কোরবানী দেওয়ার সামর্থ্য আমার আব্বার ছিল না।গ্রমীণ সমাজে মধ্যবিত্তের জন্য যা অত্যন্ত লজ্জার ব্যপার।আমার সেকি কান্না,সেইবার (১৯৭৪) আব্বার পুরানো ক্যারোলিন জামা কেটে আমার জন্য একটা জামা বানানো হয়েছিল।যা এখন আমি মিস করি।

গ্রামের হাট থেকে চাউল কিনা ছিল অত্যান্ত অসস্মানের ব্যপার, তাই আমাদের পরিবারের জন্য চাউল কেনার প্রয়োজন হলে,অন্য গবীর মানুষের সাহায্যের প্রয়োজন পড়তো।মধ্যবিত্তের আত্বসস্মান বলে কথা।কিন্তু এখন ঐ একই গ্রামের হাট থেকে আমাদের পরিবার প্রায়ই চাউল কিনে খায়।

মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে একজন বাদে সবাই উচ্চ শিক্ষার মাধ্যমে আমাদের পরিবার আজ আমার আব্বার শর্তহীন ও নি:স্বার্থ ত্যাগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত।আব্বার দীর্ঘ সংগ্রামী জীবন,রাতদিন পরিশ্রম তাঁর জীবনে সর্বউচ্চ সফলতা ও পূরণতা এনে দিয়েছিল।
কিছুদিন পর মেজ ভাইও সরকারী চাকুরী পেয়ে যান।পরে আব্বা কিছুটা হাফ ছেড়ে বেঁচে ছিলেন বলে আমার মনে হয়।আব্বার ছোট একটা কাঁঠের বাক্স ছিল, প্রায় তিনি টাকা-পয়সা গুনাগুনি করতেন।

আব্বা অতি শক্ত মনের মানুষ ছিলেন।টাকা পয়সার টানাটানি থাকলেও কাউকে বুঝতে দিতেন না।তবে তাঁর মেজাজ ও মানুষিক অবস্হা দেখে বুঝা যেতো তাঁর অর্থনৈতিক অবস্হা ভাল যাচ্ছে না।

সন্তান হিসাবে আব্বার পার্শ্বে দাঁড়ানো যোগ্যতা বা সৌভাগ্য আমার হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করার পর বেশীদিন বেকার ছিলাম না,বাংলাদেশ টেলিকমে চাকুরী পেলাম বেতন সর্বসাকুলে ছয় হাজার টাকা ছিল। আমার ছোট ভাই তখন ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে সাভারে একটা প্রজেক্টে চাকুরী করতো।ঈদের আগে দুইভাই মিলে তাও কিস্তিতে একটা সাদা-কালো টিভি বাড়িতে দিয়ে ছিলাম।

এরপর তো সুখের সন্ধানে প্রবাসে পাড়ি দিলাম এবং সাত সমুদ্র তেরো নদী পার করলাম।ডেনমার্কে আসার আগে আব্বার পা ধরে অনেক কান্নাকাটি করেছিলাম আর এটাই ছিল বাবার সাথে আমার শেষ দেখা। আরও একবার আব্বার সাথে আমার দেখা হয়েছিল স্বপ্নে( বিশ্বাস করেন)।ভোররাত সময় ৪/৫দিকে লাইফে দেখতে পেরেছিলাম,আমার আব্বা মারা যাচ্ছেন ছোট ভাই মাসুদের কাঁধে, বাস্তবে তাই-ই ঘটেছিল।

আমাকে লেখা আব্বার শেষ চিঠি খানা এখনও স্বযত্নে রেখে দিয়েছি এবং প্রায় পড়ি।আব্বার লেখা একটি লাইন এই রকম “শুনেছি তুমি একটি ঘরে একা থাকো যার খরচ অনেক বেশী,কেন মেসে থাকতে পারো না তাহলে তো খবর কম হয়”।

আব্বার সাথে আমার কোন ছবি নাই যেটা আমাকে কষ্ট দেয়,তবে আব্বার ছবি তো আমার মনে,অন্তরের অন্তস্থলে রক্তের প্রতিটি কনায়।

আব্বা একবার আমাকে এক টাকা দিয়ে গ্রামের হাটে থেকে পান কিনতে পাঠিয়েছিলেন কিন্তু সেই পান আর আব্বাকে কিনে দিতে পারি নাই। কারণ আমি তো হাটে পান কিনতেই যাচ্ছিলাম মাঝ রাস্তায় গ্রামের বন্ধুরা রয়েল গুলি খেলছিল, আমি ভেবেছিলাম এক টাকার মার্বেল কিনে ওদের সাথে খেলে জিতবো এবং সেই টাকা দিয়ে আব্বার জন্য পান কিনবো কিন্তু শেষ পর্ষন্ত জিতা হয়নি আর পানও কিনতে পারি নাই।ভয়ে সন্ধা পর্ষন্ত বাড়ি ফেরার সাহস ছিল না।

আজ আমি নিজেই একজন আমার ছেলেদের আব্বা,এখন বুঝতে পারি আব্বা কেন আমাদের পরিবারের জন্য এতো কষ্ট করতেন?আব্বারা মনে হয় এমনই হয়।কষ্টের শেষে সুখের আগমনকে আলিঙ্গন করার আগেই ডাক পড়ে যায় উপরে যাওয়ার। মনে হয় আব্বারা সংগ্রাম করার জন্যই জন্ম নেয়। আব্বাদের কোন দিবস লাগে না,সন্তানদের কাছে প্রতিটি দিনই আব্বা দিবস।
আব্বাকে আমি ও আমাদের পরিবার কোনদিন বলতে পারিনি আই/ইউ লাভ ইউ আব্বা,যা আমার বাচ্চারা আমাকে প্রতিদিন প্রতিক্ষণ প্রায়ই বলে থাকে।এ কেমন ভালবাসার রক্তের বন্ধন।

আব্বা আপনি আমাদের মাঝে নাই তবে শুনতে পান আমি ও আমাদের পরিবারের সবাই আপনাকে অনেক ভালবাসতাম এবং ভালবাসি।

মাহবুবুর রহমান: সাধারণ সম্পাদক, ডেনমার্ক আওয়ামী লীগ

The post মাহবুবুর রহমান: শর্তহীন ভালবাসা ও ত্যাগ appeared first on বিডি২৪টাইম.কম | BD24TIME.COM.

Comments

Popular posts from this blog

আইপিএলসহ টিভিতে আজকের খেলার সূচি

ঈদুল ফিতরে বেপরোয়া অটোরিকশা: খোকসায় দুর্ঘটনায় আহত ২: প্রতিকার চায় স্থানীয়রা

সৌদি রিয়াল রেট বিনিময় হারের বিশাল লম্বা লাফ ( ৩ এপ্রিল ২০২৫)

নীলফামারীতে ঈদের পরে শহরের সার্বিক নিরাপত্তা ও আইশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর নিরলস পরিশ্রম

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বনাম মানুষের কাজ: চাকরি হারাতে পারে যারা

বাংলাদেশে আজ ১৮ ক্যারেট, ২১ ক্যারেট, ২২ ক্যারেট সোনা ও রুপার দাম (২৭ মার্চ ২০২৫)

সৌদি রিয়াল রেট বিনিময় হারের বিশাল পতন (৩১ মার্চ ২০২৫)

৩ মে ঢাকায় সমাবেশ ডেকেছে হেফাজত ইসলাম বাংলাদেশ

বাংলাদেশে আজ ১৮ ক্যারেট, ২১ ক্যারেট, ২২ ক্যারেট সোনা ও রুপার দাম (৩১ মার্চ ২০২৫)

অবসরপ্রাপ্ত সেনা কল্যাণ সমিতি, তালা, সাতক্ষীরা-এর উদ্যোগে একাত্তরের বীর শহীদদের স্মরণে দোয়া ও ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত