বিদেশি বিনিয়োগ আনতে সংস্কার জরুরি বাজেটে

কালের কন্ঠ : করোনায় বিশ্বজুড়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে অর্থনীতি। মহামারির ক্ষতি কাটিয়ে অর্থনীতিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরাতে প্রয়োজন প্রচুর বিনিয়োগ। তাই সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলো ব্যবসা সহজীকরণসহ করপোরেট করে ছাড়সহ নানা প্রণোদনা দিচ্ছে। কিন্তু এফডিআই প্রবাহ বাড়ানোর ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। বিনিয়োগে পদে পদে জটিলতা ছাড়াও উচ্চহারের করপোরেট করের কারণে বিনিয়োগ ব্যয় বেড়েছে। এতে বিনিয়োগকারীরা উৎসাহ হারাচ্ছেন। তাই এফডিআই আকর্ষণে আসন্ন ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাপক নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৯ সালে দেশে যে পরিমাণ নিট এফডিআই এসেছিল, এর চেয়ে ২০২০ সালে প্রায় ১০.৮০ শতাংশ কম এসেছে। ২০১৯ সালে দেশে নিট এফডিআই এসেছিল ২৮৭ কোটি ৩৯ লাখ ডলার আর ২০২০ সালে এসেছে ২৫৬ কোটি ৩৫ লাখ ডলার। ২০১৮ সালে সাড়ে ৩০০ কোটি ডলারের বেশি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো একক বছরে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরো দেখা যায়, গত বছর সবচেয়ে বেশি ৪০ কোটি ডলারের নিট এফডিআই এসেছে নেদারল্যান্ডস থেকে। এর পরেই রয়েছে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান। আর সর্বোচ্চ ৫০ কোটি ৫১ লাখ ডলারের নিট এফডিআই এসেছে বিদ্যুৎ খাতের প্রকল্পে।

জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান গতকাল মঙ্গলবার বলেন, ‘বিদেশি বিনিয়োগ করোনার আগে থেকেই সেভাবে বাড়ছিল না। করোনা এই সংকটকে আরো গভীরতর করেছে। ব্যক্তি খাতের চাঞ্চল্য আমরা দেখছি না। ব্যবসা সহজীকরণ নিয়ে আমরা খুব একটা উন্নতি করতে পারিনি। ব্যক্তি খাতে যে ধরনের অবকাঠামো সহযোগিতা, নীতি ধারাবাহিকতা প্রয়োজন, সেগুলোও নিশ্চিত করা যায়নি। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় যেখানে ৩০ বিলিয়ন ডলারের নিট এফডিআই আসার কথা ছিল, সেটা মাত্র ১০-১১ বিলিয়ন ডলার এসেছে। বর্তমানে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যেসব সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো আসন্ন বাজেটেও অব্যাহত রাখতে হবে। ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সময় বলেছেন, করকাঠামো ব্যবসাবান্ধব নয়। আমরা আশা করব, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা হচ্ছে, সেসবের সমাধান হবে। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগে উৎসাহ ছাড়া কর্মসংস্থান আগের জায়গায় নেওয়া যাবে না।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের সমস্যাগুলো ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে। দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর মধ্যে ১০-১৫টি দ্রুত চালু করা গেলে বিদেশি ও দেশি বিনিয়োগ বাড়বে।’

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান গতকাল বলেন, ‘দেশের উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের জন্য বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু আমরা দেখছি, অনেক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ছে না। দেশি বিনিয়োগও স্থবির হয়ে আছে। প্রতিযোগী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি এফডিআই আকৃষ্ট করে। বাজেটে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিগত সংস্কারের পাশাপাশি বিদ্যমান নীতি বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ওয়ানস্টপ সার্ভিস নিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রায়ই অভিযোগ করেন। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (বিডা) দ্রুত ওয়ানস্টপ সার্ভিস পুরোপুরি কার্যকর করতে হবে।’

এদিকে দেশে এমন খাতও আছে, যেখানে ব্যবসা শুরু করতে ২৮টি লাইসেন্স লাগে। প্রতিটি লাইসেন্সের আবেদন যদি নির্দিষ্ট কার্যালয়ে এক মাস পড়ে থাকে, তাহলে ২৮ মাস লাগবে। এসব ক্ষেত্রে ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ অনেক দিনের।

বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম বলেছেন, বিশ্বব্যাংকের ব্যবসা সহজ করার সূচকে এখনই বাংলাদেশ দুই অঙ্কের ঘরে (৯৯ নম্বরে) উন্নীত হবে, বিষয়টি এত সহজ নয়। কারণ ব্যবসা পরিস্থিতির উন্নতির কথা যতক্ষণ ব্যবসায়ীরা না বলবেন, ততক্ষণ বিশ্বব্যাংক পয়েন্ট দেবে না। আবার ব্যবসায়ীরাও বিশ্বব্যাংকের উপসূচকগুলো সম্পর্কে তেমন একটা সচেতন নন। যদিও ২০২১ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের ব্যবসা সহজ করার সূচকে বাংলাদেশকে দুই অঙ্কের ঘরে (৯৯ নম্বরে) নামানোর লক্ষ্য ঠিক করা হয়। সর্বশেষ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৬৮তম।

সিরাজুল ইসলাম একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘কিছুদিন আগে একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী আমার কাছে অভিযোগ করেন, তাঁর কাছে অনৈতিকভাবে অর্থ চেয়ে নাজেহাল করা হয়েছে। অনৈতিক অর্থ না দেওয়ায় যা করযোগ্য নয়, তাতেও কর দাবি করা হয়েছে। ওই বিদেশি বিনিয়োগকারী বিডার কাছে সমাধান চেয়েছেন।’ এ ধরনের অনৈতিক লেনদেনের বিষয় আছে, যা ব্যবসা সহজ করার ক্ষেত্রে বাধা বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ে এক জমি নামজারি করতে ৭২ হাজার টাকা লাগে। কেন চাওয়া হয়, এর কোনো উত্তর নেই। আরজেএসসিতে নিবন্ধন নিতে গেলে সরাসরি কাজ হয় না। সেখানে গেলে বলা হয়, পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আসতে হবে। এভাবে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের চক্র গড়ে উঠেছে।’

এদিকে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বেশির ভাগ উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় বাংলাদেশে করপোরেট করহার বেশি। বাংলাদেশে করপোরেট করহার ভিয়েতনামের তুলনায় ১৫ শতাংশ, মালায়েশিয়ার তুলনায় ১১ শতাংশ, চীন, ইন্দোনেশিয়া ও মিয়ানমারের তুলনায় ১০ শতাংশ, পাকিস্তানের তুলনায় ৬ শতাংশ এবং ভারত ও ফিলিপাইনের তুলনায় ৫ শতাংশ বেশি।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (ডিসিসিআই) সভাপতি রিজওয়ান রহমান গতকাল বলেন, ‘আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় আমরা করপোরেট করের ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছি। গ্লোবাল এভারেজ, এশিয়া এভারেজের চেয়েও আমাদের করপোরেট কর বেশি। তাই বাজেটে আমাদের ট্যাক্স কম্পিটিটিভনেসের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। আমরা ঢাকা চেম্বার থেকে এ বছর আড়াই শতাংশ, এর পরের বছর আড়াই শতাংশ এবং পরের বছর আরো আড়াই শতাংশ—এভাবে আগামী তিন বছরে তা কমিয়ে ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। আমরা শুনছি, এবার বাজেটে করপোরেট কর আড়াই শতাংশ কমানো হবে। টিকার জন্য বিশেষ বরাদ্দ বাড়াতে হবে, টিকা কূটনীতি জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবসা সহজীকরণ ও ব্যবসা সহায়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন করতে হবে।’

The post বিদেশি বিনিয়োগ আনতে সংস্কার জরুরি বাজেটে appeared first on বিডি২৪টাইম.কম | BD24TIME.COM.

Comments

Popular posts from this blog

আইপিএলসহ টিভিতে আজকের খেলার সূচি

ঈদুল ফিতরে বেপরোয়া অটোরিকশা: খোকসায় দুর্ঘটনায় আহত ২: প্রতিকার চায় স্থানীয়রা

সৌদি রিয়াল রেট বিনিময় হারের বিশাল লম্বা লাফ ( ৩ এপ্রিল ২০২৫)

নীলফামারীতে ঈদের পরে শহরের সার্বিক নিরাপত্তা ও আইশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর নিরলস পরিশ্রম

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বনাম মানুষের কাজ: চাকরি হারাতে পারে যারা

বাংলাদেশে আজ ১৮ ক্যারেট, ২১ ক্যারেট, ২২ ক্যারেট সোনা ও রুপার দাম (২৭ মার্চ ২০২৫)

সৌদি রিয়াল রেট বিনিময় হারের বিশাল পতন (৩১ মার্চ ২০২৫)

৩ মে ঢাকায় সমাবেশ ডেকেছে হেফাজত ইসলাম বাংলাদেশ

বাংলাদেশে আজ ১৮ ক্যারেট, ২১ ক্যারেট, ২২ ক্যারেট সোনা ও রুপার দাম (৩১ মার্চ ২০২৫)

অবসরপ্রাপ্ত সেনা কল্যাণ সমিতি, তালা, সাতক্ষীরা-এর উদ্যোগে একাত্তরের বীর শহীদদের স্মরণে দোয়া ও ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত