যে নারীর কারণে মরতে হলো আইএসপ্রধান বাগদাদিকে
আইএস প্রধান আবু বকর আল বাগদাদির আস্তানায় অভিযান চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করছে মার্কিন সেনা। রোববার সেই অভিযানের ভিডিও প্রকাশ করেছে ইরাকি টেলিভিশন।
সংবাদ মাধ্যমটি জানায়, আইএসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান আবু বকর আল-বাগদাদিকে হত্যার উদ্দেশে ইরাকের উত্তরাঞ্চল থেকে আটটি হেলিকপ্টারে করে গভীর রাতে সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমে অভিযান শুরু করে মার্কিন সেনারা।
মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের সেই অভিযানের নাম ছিল ‘কায়লা মুয়েলার’। আর এ নামকরণের পেছনে রয়েছেন এক মার্কিন দাতব্য কর্মী। তার নামই কায়লা মুয়েলার।
ওই মার্কিন নারীর নামে বাগদাদি হত্যা মিশনের নাম রাখার কারণ হিসেবে জানা গেছে, কায়লা মুয়েলার হত্যাকাণ্ডে আবু বকর আল-বাগদাদি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।
মার্কিন সেনাবাহিনীর দাবি, বাগদাদি কায়লা মুয়েলারকে অপহরণের পর ধর্ষণ করে হত্যা করেছিল বাগদাদি। তাই ওই নারীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে অভিযানটির এ নাম রাখা হয়। ২০১২ সালে সিরীয় শরণার্থীদের জন্য কাজ করতে প্রথম তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তে গিয়েছিলেন কায়লা মুয়েলার। সে সময় তিনি ২৬ বছর বয়সী নারী ছিলেন।
২০১৩ সালে সিরিয়ার আলেপ্পোতে অপহৃত হন কায়লা। এরপর দীর্ঘদিন তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। তার অবস্থান নিয়ে ধুম্রজালের সৃষ্টি হয়।
জানা যায়, আইএস প্রধান আবু বকর আল বাগদাদির অধীনে জিম্মি হয়ে আছেন কায়লা। জিম্মি থাকার সময় ২০১৪ সালে বাবা-মাকে পাঠানো এক চিঠিতে মুয়েলার লেখেন, ‘তোমরা কান্নাজড়িত যেসব চিঠি আমাকে পাঠিয়েছ, সেগুলোর কথা চিন্তা করে আমি কেবল চিঠিই লিখতে পারি। আমি জানি, তোমরা তীব্রভাবে আমাকে ফিরে পেতে চাও। আমি সে জন্য চেষ্টা করছি।’
এরপর পেরিয়ে যায় এক বছর। এরপর কায়লা নিহত হয়েছেন বলে খবর প্রচারিত হয়। ২০১৫ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা নিশ্চিত করেন, কায়েলা মুয়েলার নিহত হয়েছেন। আইএসের হাতে আটকের পর নিহত চতুর্থ মার্কিনী তিনি। তবে কায়েলার মৃত্যু নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরেই বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল।
সে সময় পেন্টাগন দাবি করেছিল, আইএসই কায়লাকে হত্যা করেছে। এ বিষয়ে মার্কিন সেনাদের কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেন, আবু বকর বাগদাদি নিজেই মুয়েলারকে নির্মম নির্যাতন করে এবং পরে তাকে হত্যা করে।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো থেকে বলা হচ্ছিল, মুয়েলারকে আত্মরক্ষার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিল বাগদাদি। তবে শুরু থেকে মার্কিন তরফের এসব দাবি অস্বীকার করে আসছে আইএস। আইএস বলছে, জর্ডানের বিমান হামলায় মুয়েলার নিহত হয়েছেন।
আইএস যাই দাবি করুক সেই মার্কিন নারী দাতব্য কর্মী যে আর পৃথিবীতে নেই তা একেবারে নিশ্চিত এবং আইএসই তাকে পাশবিক নির্যাতন করে হত্যা করেছে সে কথায় অনড় মার্কিন প্রশাসন।
শনিবার রাতে মার্কিন সেনাদের কায়েলা মুয়েলার অভিযানে নিহত হয়েছেন বাগদাদি। বিষয় নিশ্চিত করে হোয়াইট হাউজে বিবৃতিও দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ঘটনাসংশ্লিষ্ট এক ইরাকি কর্মকর্তা বলেন, ‘সিরিয়ার কোথায় কোথায় তারা বাগদাদির সঙ্গে বৈঠক করেছেন সবগুলোর তথ্য আমাদের জানান তারা। ওই এলাকাগুলোর ভেতরে আরও সূত্র মোতায়েনের জন্য সিআইএর সঙ্গে সমন্বয় করার সিদ্ধান্ত নিই আমরা। ২০১৯ এর মাঝামাঝি আমরা ইদলিবকে শনাক্ত করি যেখানে বাগদাদি তার পরিবার ও তিন ঘনিষ্ঠ সহযোগীসহ অনবরত এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে চলে যাচ্ছিলেন।’
এই সময় সিরিয়ায় থাকা গুপ্তচররা ইদলিবের বাজারে চেক স্কার্ফে মাথা ঢাকা এক ইরাকিকে দেখতে পান এবং একটি ছবির সঙ্গে মিলিয়ে তাকে শনাক্ত করেন। এই ব্যক্তিটি ইথাবি ছিলেন বলে জানিয়েছেন ইরাকি কর্মকর্তারা। চররা ইথাবিকে অনুসরণ করে বাগদাদি যে বাড়িতে অবস্থান করছিলেন, তার খোঁজ পান।
এরপর স্যাটেলাইট ও ড্রোন ব্যবহার করে গত পাঁচ মাস ধরে ওই এলাকার ওপর নজরদারি চালানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের দুই দিন আগে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একটি মিনিবাসে করে বাগদাদি ওই এলাকা ছেড়ে নিকটবর্তী একটি গ্রামে চলে যান।
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, উত্তর ইরাক থেকে আটটি হেলিকপ্টার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা কয়েকশ মাইল পাড়ি দেয় গত রবিবার ভোরে। তাদের টার্গেট ছিলেন বাগদাদি। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর একটি এলিট ফোর্স ‘অপারেশন কায়লা মুয়েলার’ কোড নামে ওই অভিযান চালায়।
ট্রাম্প এই অভিযানকে ‘বিপজ্জনক ও রাত্রিকালীন বেপরোয়া অভিযান’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা যখন এগিয়ে যাচ্ছিল বাগদাদি তখন পালাতে শুরু করেন এবং একটি সুড়ঙ্গ পথের শেষ প্রান্তে গিয়ে সুইসাইড ভেস্টের বিস্ফোরণ ঘটান। এতে তিন সন্তানসহ বাগদাদি মারা গেছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অন্য কর্মকর্তারা বাগদাদির শেষ সময়ের কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
অভিযান চালানোর সময় ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে ছিলেন। হোয়াইট হাউজের প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, ট্রাম্পের পাশে বসে রয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স, প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপার, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা রবার্ট ও’ব্রায়েন এবং সেনাবাহিনীর জেনারেল ও জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান মার্ক মাইলি ও বিমানবাহিনীর লেফটেন্যান্ট জেনারেল স্কট হোয়েল।
বার্তাবাজার/কে.জে.পি
Comments
Post a Comment